মায়া, বদির সংসদ সদস্য পদ এবং হাজী সেলিমের মনোনয়ন বৈধ কিভাবে? : রুহুল কবির রিজভী

‘যে বিবেচনায় বিএনপি নেতাদের মনোনয়ন বাতিল করা হলো সে একই বিবেচনায় মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং কক্সবাজারের সাংসদ আব্দুর রহমান বদি’র সংসদ সদস্য পদ কি অবৈধ নয় ? ১৩ বছরের সাজা নিয়ে শুধুমাত্র আপিল করে এখনও এমপি হিসেবে বহাল আছেন হাজি সেলিম, তার মনোনয়নপত্রও বৈধ কিভাবে’ বলে প্রশ্ন করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। সংবাদ সন্মেলনের সম্পূর্ণ বক্তব্য নিম্নরূপ।

সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আস্সালামু আলাইকুম। সবার প্রতি রইল আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং অফিসার’রা মূলত: সৎমায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ডেকে এনে বৈঠক করে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেই নির্দেশনা অনুযায়ী বিএনপিসহ বিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র গণহারে বাতিল করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপত্রে অসংখ্য ত্রুটি থাকার পরেও সেগুলোকে বাতিল করা হয়নি। দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত হওয়ার তথ্য গোপনের অভিযোগ থাকার পরেও সরকারি দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রিটার্নিং অফিসার হায়াত উদ দৌলা খানের কার্যালয়ে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রমে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া কোন প্রার্থীকে কথা বলার সুযোগ দেননি তিনি। বিএনপি’র মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া বেশীরভাগ প্রার্থীদেরকেই কথা বলতে দেননি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিটার্নিং অফিসার।

নির্বাচনী আচরণবিধির বিধান হচ্ছে-প্রার্থীদের বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে তাদেরকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। কোন ডকুমেন্টস উপস্থাপন করতে চাইলে তা করতে দিতে হবে। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তা যদি শুরুতেই প্রার্থীকে থামিয়ে দেন, তাহলে বুঝতে হবে রিটার্নিং অফিসার দুরভিসন্ধি নিয়ে কাজ করছেন। এভাবে সারাদেশেই রিটার্নিং অফিসার’রা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিএনপি’র মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। তফশীল ঘোষনার পরে রিটার্নিং অফিসার’রা নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে কাজ করেন, সেক্ষেত্রে তাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া চলবে না। কিন্তু যদি রিটার্নি অফিসার বা নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত অন্য কোন কর্মকর্তা কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থের পক্ষে কাজ করেন, তাহলে তা হবে গুরুতর অসদাচরণ। এটি সমগ্র নির্বাচন কমিশনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন কমিশন, শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্য এবং নির্বাচনে ভোট গ্রহণকারি কর্মকর্তাদের ভোটে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়, জনমনে শঙ্কা ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি দেশব্যাপী রিটার্নিং অফিসারদের কর্মকান্ডে নির্বাচনে জনমতে সঠিক প্রতিফলন ঘটকে কি না তা নিয়ে মানুষের মধ্যে জিজ্ঞাসা তৈরী হয়েছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত রিটার্নিং অফিসার’রা যা করছেন তা কেবলই প্রহসন। আয় কমে গেলেও ক্ষমতাসীন মন্ত্রী-নেতাদের সম্পদ বাড়ে, অথচ এগুলিতে দুদক ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চোখ এড়িয়ে যায়। আসন্ন নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও দেশব্যাপী গভীর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের আগ্রাসী তৎপরতা ও নির্বিচারে দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার অভিযানে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনেরই ছবি মানুষ দেখতে পাচ্ছে। যেন পাতানো কিছু একটা করতে যাচ্ছে অবৈধ শাসকগোষ্ঠী। স্বৈরশাসিত এই দেশে আগামী দিনে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধ:পতনের লক্ষণগুলিই ফুটে উঠছে। তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে জনবিরোধী কোন পদক্ষেপ নিতে গেলে এই অবৈধ আধিপত্য অভিলাষী সরকার নিজেরাই নিজেদের পতন ডেকে আনবে। ভোটারদের বঞ্চিত করে ভাগ্নে শাহজাদাদের বিজয়ী করার নির্বাচন জনগণ মেনে নেবে না। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পুলিশের ওপর নির্ভরপরায়ণ ও সামর্থহীন। সুতরাং গণভিত্তি নেই বলেই এদের পতন অত্যাসন্ন।
সাংবাদিক বন্ধুরা,
হাইকোর্টে ডাঃ এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও আমানউল্লাহ আমানসহ বিএনপি’র পাঁচ নেতার আবেদন নাকচ হওয়ার দিনে এ্যাটর্নি জেনারেল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন-কারও দন্ড হলে আপিল বিচারাধীন থাকলেই চলবে না, এমনকি আপিলে মুক্তি পেলেও নিস্তার নেই। কারণ সংবিধান অনুযায়ী দন্ডিত ব্যক্তিকে মুক্তিলাভের পর ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এরপর তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে যোগ্য হবেন।

এখন আমাদের প্রশ্ন-এ্যাটর্নি জেনারেলের এই ব্যাখা যদি বিবেচনায় নেয়া হয় তাহলে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং কক্সবাজারের সাংসদ আব্দুর রহমান বদি’র সংসদ সদস্য পদ কি অবৈধ নয় ? এ্যাটর্নি জেনারেল নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে সংবিধান ও আইনের ব্যাখা দেন সরকার প্রধানকে খুশী করার জন্য। মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের আমলে ২০০৭-০৮ সালে ক্যাঙ্গারু কোর্টে বিএনপি’র যে নেতারা দন্ডিত হয়েছিলেন তাদের আপিল বিচারাধীন থাকলেও তাদের সবার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। অথচ ঐ ক্যাঙ্গারু কোর্টে দন্ডিত ও সাজা স্থগিত না থাকা অবস্থায় দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মখা আলমগীর। ১৩ বছরের সাজা নিয়ে শুধুমাত্র আপিল করে এখনও এমপি হিসেবে বহাল আছেন হাজি সেলিম, তার মনোনয়নপত্রও বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের স্বার্থে আইন একধরণের ও বিএনপির ক্ষেত্রে আইন আরেক ধরণের। এ্যাটর্নি জেনারেলের ব্যাখাও একইরকম। আদালত প্রাঙ্গনে রাসপুটিনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এটর্নি জেনারেল। বিরোধী দলশুন্য করতে সরকারের এজেন্ডা এখন এটর্নি জেনারেল আদালতকে ভয় দেখিয়ে বাস্তবায়ন করছেন। বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আমিনুল হকের দু’টি মামলার বিচারিক আদালতে সাজা হাইকোর্ট বাতিল করে দেয়, আপিল বিভাগও তা বহাল রাখে। এসব তথ্য তিনি হলফনামায় দেয়ার পরও তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এখন বাতিলের সার্টিফায়েড কপিও তাঁকে দেয়া হচ্ছে না। তাঁকে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও দেয়া হচ্ছে না। মূলত: রিটার্নিং কর্মকর্তারা সরকারের নির্দেশই পালন করছে। আর সরকারের নির্দেশেই বিএনপি নেতাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
বন্ধুরা,
গ্রেফতার ঃ
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ পল্টন থানা বিএনপি’র সভাপতি লোকমান হোসেন ফকিরকে গতরাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কোথাও তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আটকের বিষয়টি অস্বীকার এখন সীমা অতিক্রম করেছে। আমি অবিলম্বে লোকমান হোসেন ফকিরের সুস্থাবস্থায় তার পরিবারের নিকট ফিরিয়ে দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
এছাড়া ৩৩ নং বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রাসেলকে কয়েকদিন আগে তুলে নেয়ার পর আজকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
গতকাল কক্সবাজার জেলাধীন পেকুয়া উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুজ্জামান মঞ্জুসহ দু’জনকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নাশকতার মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নাকি নাশকতার পরিকল্পনা করছে এই অজুহাতে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের নামে কোনও ওয়ারেন্ট ছিল না। আমি পুলিশ কর্তৃক অধ্যাপক নুরুজ্জামান মঞ্জুসহ দু’জনকে গ্রেফতার ও নাশকতার মামলা দায়েরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে অসত্য ও বানোয়াট মামলা প্রত্যাহারসহ তাদের নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।
ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল আমিন এবং মো: রিপনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।
আমি বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তাদের অসত্য ও হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহারসহ অবিলম্বে নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।

সবাই ভাল থাকুন, ধন্যবাদ।

Close Menu
×