স্বাধীনতার ঘোষণা পর্ব: শহীদ জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক

স্বাধীনতার ঘোষনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতদিন এই গুরুত্ব অনেকেই অনুভব করেন নি। দেশে দেশে যে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন তিনিই সেই জাতির অভিভাবক হয়ে উঠেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখবো এই দেশের ভৌগলিক সার্বভৌমত্ব লাভ করবার আগেথেকেই মানসিকভাবে সার্বভৌমত্ব এইদেশের জনগনের মধ্যে চলে আসে। পাকিস্তান রাষ্ট্র ঘটনা যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে সেটা কায়েদে আযম নিজেও আঁচ করতে পেরেছিলেন। এরপর বাংলাদেশ স্বাধিনতা আন্দোলন পাকিস্তানীদের চাপিয়ে দেয়া একটি বিষয় ছিলো। যারা পাকিস্তান অর্জনের সাথে জড়িত ছিলো তারাই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যত জন মানুষ মারা গেছে তার মধ্যে সাধারন মানুষের সংখ্যাই বেশি। হয়তো যুদ্ধের পরিকল্পনা থাকলে এত মানুষের প্রান দিতে হতো না। অন্যদিকে মুকিযুদ্ধের ধারক বাহক হিসাবে নিজেদেরকে জাহির করা আওয়ামী লিগের তেমন কোন নেতা মারা গেছেন বলে জানা যায়নি।আওয়ামী লিগের একজন প্রথম সারির নেতা যুদ্ধে নিহত হন নি। এটা আসলে বিস্ময়কর লাগে শুন্তে। এর পরে খন আরেকটি বিষয় এসে জুটেছে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষনা নাকি অবৈধ। আদালতের ফরমানের মাধ্যেমে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এই রায়কে মেনে নেয়নি। সত্যকে মিথ্যা মিথ্যাকে সত্য এই তত্ত্বে যে বিচার প্রক্রিয়া হলো তাতে বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের হ্নদয়ে আঘাত হেনেছে। শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধিনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন। এই সত্য কথাটি প্রমান বা প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তি আজ ঐক্যবদ্ধ। 

রহস্যময় আগন্তুক

কক্সবাজার যাওয়ার পথে কালুরঘাট ব্রীজ পেরুলেই রাস্তাটা একটা ঢালের তীক্ষ্ম বাক নিয়েছে। তারপর এগিয়ে গেছে সোজা পটিয়া, দুলাহাজরা এবং কক্সবাজার হয়ে মূল ভুখন্ডের সর্ব দক্ষিণের প্রান্ত টেকনাফের দিকে। ঢালের শেষ মাথায়, যেখানে রাস্তাটা আবার সোজা হয়েছে একটা পেট্রোলপাম্প আছে। পাম্পটা ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, অন্ধকারে ডুবে ছিল জায়গাটা। একপাশে কিছু গাছের গুড়ি স্তুপাকারে রাখা, কিছু খালি বাসও ছিলও এখানে। পলায়নপর ড্রাইভাররা ফেলে রেখে গিয়েছিল। পাম্প স্টেশনের আশেপাশে গোটাকতক গাড়ী আর পিকআপও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা ছিলো। ক্রমশ রাত ঘনিয়ে এলো।

রাত তখন আটটা। একটা গুড়ির উপর বসে কথা বলছিলাম আমি আর অলি। একটা বাসের ভেতর বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন জিয়া। হঠাৎ একটা লোককে এগিয়ে আসতে দেখলাম আমরা। মোটামুটি দীর্ঘকায়, চমৎকার চেহারা, মাথায় লম্বা চুল, বয়স মধ্য ত্রিশের মতো হবে। আগন্তুক আমাদের কাছে এসে জানালেন, জিয়ার খোজ করছেন তিনি। মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমি আর অলি। কারণ ওই অবস্থায় ব্যাপারটা কেমন যেন রহস্যময় মনে হচ্ছিল। যাহোক, আমরা তার পরিচয় জানতে চাইলাম। জিয়াকে তিনি চেনেন কিভাবে? কিন্তু পরিচয় বা উদ্দেশ্য জানাতে রাজী হলেন না ভদ্রলোক। জিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য জোর করলেন। আমি চমৎকার আমেরিকান উচ্চারণ ভঙ্গীতে আলাপরত আগন্তুককে নিয়ে ব্যস্ত। ঠিক তখন ক্যাপ্টেন অলি গিয়ে জিয়াকে নবাগতের উপস্থিতির কথা জানালেন। একটু বাদেই অলি ফিরে এসে বললেন, ভদ্রলোককে বাসের ভেতর নিয়ে যেতে বলেছেন জিয়া।

আগন্তুককে নিয়ে আমরা বাসে অপেক্ষারত জিয়ার কাছে এলাম। জিয়া আমাদের দুইজনকে বেরিয়ে যেতে ইশারা করলেন। আগন্তুককে আগেই তল্লাশী করা হয়েছিল, জিয়ার একখানা ফটোগ্রাফ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি তার কাছে। আগন্তুকের সঙ্গে জিয়াকে একা রেখে বেরিয়ে এলাম আমরা।…

 (মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় প্রথম প্রতিরোধ : লে.জে মীর শওকত আলী, গোলাম মোস্তফা সম্পাদিত অনন্য জিয়াউর রহমান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগস্ট ২০০৪)

২৭ মার্চের সে রাতের ঘণ্টাখানেক একান্ত আলাপচারিতার পর আগন্তুক যখন বেরিয়ে গেলেন, জিয়া তার পরিচয় দিলেন সঙ্গীদের। লোকটা আমাদের বন্ধু, আমাদের একটা উপকার করতে চায়। কি উপকার, কি তার ধরণ সে আলোচনায় একটু পরেই আসছি। কিন্তু মীর শওকতের লেখায় বা আর কোথাও সেই ফটোগ্রাফের রহস্য মেলে না। কিভাবে একজন বিদেশীর বুকপকেটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসারের ছবি এলো তা জানা হয় না আমাদের। তার আগেই অবশ্য বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়া তার স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটা পড়ে ফেলেছেন।

ইন্দিরা গান্ধীর ভাষ্যঃ

পাকিস্তানের কারাগারে আটক শেখ মুজিবকে পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে বিচারের প্রহসন করে হত্যার উদ্যোগ নিলে প্রধানমন্ত্রী গান্ধী মুজিবের পে জনসমর্থন সৃষ্টির লক্ষ্যে পৃথিবীর কয়েকটি গুরুত্বপুর্ণ রাজধানী সফরকালে ৬ নভেম্বর, ১৯৭১ তারিখে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় বলেন:

The cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as I know, has not ask for independence even now.

Ref. Bangladesh documents vol-II, page 275 Ministry of external affairs, Govt of India-1972|

মুজিব নিজেই বলেছিলেন ৭ মার্চে আমি স্বাধীনতা ঘোষনা করি নাইঃ

১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারী খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রষ্টকে নিউনিয়র্কের এন ডবিউ টিভির জন্য এক সাক্ষাতকার দেন। ঐ সাক্ষাতকারের সাথে মার্চের ভাষন সম্পর্কে তার মধ্যকার আলাপচারিতা তুলে ধরা হলো।

ফ্রস্ট; আপনার কি ইচ্ছা ছিলো যে, তখন ৭ মার্চ আপনি স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষনা দেবেন।

শেখ মুজিবঃ আমি জানতাম এর পরিণতি কি হবে এবং সভায় আমি ঘোষনা করি যে এবারের সংগ্রাম মুক্তির এবং শৃঙ্খল মোচন এবং স্বাধীনতার।

ফ্রষ্টঃ আপনি যদি বলতেন আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষনা করছি, তো কি ঘটতে পারতো।

শেখ মুজিবঃ বিশেষ করে ঐ দিনটিতে এটা করতে চাইনি। কেননা বিশ্বকে তাদের এই বলার সুযোগ দিতে চায়নি যে মুজিবর

রহমান স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প ছিলো না। আমি চাইছিলাম তারাই আগে আঘাত হানুক এবং জনগন তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিলো।

সৈয়দ আলী আহসান ভাষ্যঃ

সৈয়দ আলী আহসান ২ জানুয়ারি ২০০২ দৈনিক মানবজমিনের সঙ্গে সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘‘২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান নিজ দায়িত্বে নিজেকে প্রভিশনাল বাংলাদেশের চিফ ইন কমান্ডার ও রাষ্ট্রপ্রধান বলেছেন। এটা কেউ তাকে বলেনি। এটা ঠিক-কি ঠিক করেননি তা আমি বলছি না। তিনি একার দায়িত্বে বলেছেন, এটা জানি, যুদ্ধ শুরুর পর পর দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে, সেজন্য দেশের পক্ষে কোনো একটা লোককে কিছু তো বলতে হবে। তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন। এর আগে রাজনৈতিক নেতারা কেউ কিছু বলেননি। আওয়ামী লীগের নেতারা পালিয়ে গেলেন। ইন্ডিয়ায় তারা কেউ কোনো স্টেটমেন্ট দিলেন না। শেখ মুজিব নিজে ধরা দিলেন পাকিস্তানের কাছে। তিনি বাড়িতে এসে রইলেন পাকিস্তানীরা কখন আসবেন। পাকিস্তানীরা তার বাড়িতে আসলেন, তাকে ধরে নিয়ে গেলেন।এই তো ব্যাপার,২৬ মার্চ আমার জন্মদিন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সেদিনের বিকেল বেলা আমরা চট্টগ্রাম শহরে ছিলাম। ২৪ তারিখ আমার বড় মেয়ে, মেয়ের জামাইও ওদের ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাই। আমার ছোট মেয়ে ও জামাতা চট্টগ্রাম শহরে একটি বাসায় থাকতো। তাদেরও নিয়ে আসি। রশিদ চৌধুরী, তার স্ত্রী, দু’মেয়ে বাসায় আসেন। এই ক’জন মিলে আমরা জন্মদিনের উৎসব পালন করি। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। অসহযোগ চলছিল। সন্ধ্যার সময় কিংবা বিকেল হতে পারে, আমরা ছোট রেডিওটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শোনার চেষ্টা করছিলাম কোথাও কিছু শোনা যায় কিনা। তখন হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর শুনলাম, অচেনা-অজানা কণ্ঠস্বর, বললেন, মেজর জিয়া বলছি। ২৬ মার্চ তিনি নিজেকে প্রভিশনাল বাংলাদেশের চিফ ইন কমান্ডার ও রাষ্ট্র প্রধান ঘোষণা করে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা বললেন এবং স্বাধীনতার ডাক দেন, সেই সময় তিনিই ছিলেন। তিনি ছাড়া অন্য কোন সেনাপতি ও সৈনিকের খবর তখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। একমাত্র তার খবর পাওয়া যায়। মেজর জিয়া, আমরা চট্টগ্রামে ছিলাম। সেখানে জিয়াউর রহমান ছিলেন এটা জানি। অন্য কেন্দ্রে কেউ ছিলেন কিনা তা জানি না। কালুরঘাট ছিল আমাদের ট্রান্সমিশন সেন্টার। সেখান থেকে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা মুছে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিংবা অন্য কোনোভাবে ধ্বংস করা হতে পারে। এটা সঠিকভাবে বলতে পারবো না। ধ্বংসের কাজটি যারা করেছেন, তারা ঠিক করেননি। মুছে ফেলে ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করে তথ্য উপস্থাপন করলে তার ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিলেও মিথ্যা ইতিহাস হতে পারে, স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়াউর রহমান। এ কথা আমি আগেও বলেছি। আমার বহু আগের বইতে আমি লিখেছি। তখন এর কেউ প্রতিবাদ করেনি। কারণ, এটা ধ্রুব সত্য, এর প্রতিবাদ হবে না… জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক। এই কথা জিয়াউর রহমান যদিও স্পষ্টভাবে লিখে যাননি। কিন্তু তাও সত্য, ঘোষণা তিনিই দিয়েছিলেন। তার সাথে আমি ঘনিষ্ঠভাবে ছিলাম। তার একটা গুণ ছিল, যেটা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে নেই, ছিল না। তিনি কোনো কন্টোভার্সিতে জড়াতে চাইতেন না। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নাম কখনো অশোভনভাবে নিতেন না।

(সূত্র : দৈনিক দিনকাল ৭ নবেম্বর ১৯৯৮)‘আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি, চেয়েছিল পাকিস্তানের ক্ষমতা’ শিরোনামে কলামিস্ট হারুনুর রশীদ লিখেছেন, ‘‘ ৭ মার্চ শেখ মুজিব এই বাক্যটি উচ্চারণ করলেও তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে একটা সমঝোতা করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য। এজন্যই তিনি ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সঙ্গে নিরলস আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং ২৩ মার্চ তারিখেও সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, ইয়াহিয়া ভুট্টোর সঙ্গে তার আলোচনার অগ্রগতি হচ্ছে। এমনকি পাকিস্তানী হানাদারকে ক্র্যাক ডাউনের মাত্র ঘণ্টাখানেক আগেও শেখ মুজিব তার সে সময়কার সবচেয়ে নিকটতম সহযোগী ড. কামাল হোসেনের কাছে ব্যাগ্রতার সঙ্গে জানতে চেয়েছিলেন, পরদিন (২৬ মার্চ) তার সঙ্গে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর বৈঠকে প্রোগ্রাম আছে কি না? (ড. কামাল হোসেন লিখিত প্রবন্ধ, দি ডেইলী নিউজ, ২৬ মার্চ, ১৯৮৭ সংখ্যা) স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন স্থির করেই থাকেন তাহলে- প্রথমত, আওয়ামী লীগের কোন কমিটিতে কখনও এই মর্মে কোন গোপন বা প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি কেন? দ্বিতীয়ত, হানাদারের ক্র্যাক ডাউনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও কেন তিন ২৭ মার্চ দেশব্যাপী হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন? ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে (অর্থাৎ ২৬ মার্চ) শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলে ২৭ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল ডাকার যৌক্তিকতা কি ছিল? তৃতীয়ত, তিনি যদি স্বাধীনতাই ঘোষণা করবেন, তাহলে ক্র্যাক ডাউনের মাত্র এক ঘণ্টা আগে পরদিন ইয়াহিয়-ভুট্টোর সাথে বৈঠকে বসার ব্যাপারে ব্যাগ্রতা প্রকাশ করেছিলেন কেন? চতুর্থত, পৃথিবীতে যখনই কেউ ঔপনিবেশিক শক্তি বা দখলদারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখনই অবশ্যম্ভাবীরূপে গঠন করে পাল্টা সরকার, যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকলে গঠন করেন পাল্টা প্রতিরক্ষা ও আঘাত হানার ব্যবস্থা এবং কমান্ড স্ট্রাকচার ও চেইন অব কমান্ড। শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করলেন না কেন? কেন গঠন করলেন না চেইন অব কমান্ড? আজ যারা যে দাবিই করুন না কেন, সেদিন আমরা যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলাম তারা তো জানি শেখ মুজিব স্বয়ং ও আওয়ামী নেতৃত্ব কখনোই স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন না। তারা চেয়েছিলেন পাকিস্তানের ক্ষমতা। । দ্বিতীয়ত, প্রতিরোধ যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ করতে হলে দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য একটি সরকার অনিবার্য। তৃতীয়ত, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেহেতু পাকিস্তান পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছিল, সেহেতু আওয়ামী লীগের এম.এল.এ-এমপিদেরকেই বলা যেতো বাংলাদেশের জনগণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি এবং তাদেরকে নিয়ে গঠিত সরকারের পক্ষেই সম্ভবপর ছিল সহজে দেশী-বিদেশী স্বীকৃতি পাওয়া। এককথায় স্বাধীনতা চাক বা না চাক, ওই সময় আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য কাউকে দিয়ে সরকার গঠনের মতো সাংগঠনিক প্রতিনিধিত্বশীল ও কূটনৈতিক বিকল্প ছিল না। এটাও লক্ষণীয় যে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাসহ বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ নিহত হলেও আওয়ামী লীগের একজন এমএলএ (শুধু মশিউর রহমানের ব্যাপার ছিল ভিন্ন), একজন এমপি, একজন কেন্দ্রীয় নেতা, এমনকি জেলা পর্যায়ের একজন সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকও মুক্তিযুদ্ধে নিহত হননি। এতেই বুঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ কতোটা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা যাই-ই করুন না কেন, ১০ সেক্টর কমান্ডারের নেতৃত্বাধীন অফিসার, জওয়ান ও লাখ লাখ তরুণ যুবকরা, হানাদারদের বিরুদ্ধ লিপ্ত হয়েছিল, পৃথিবীর ইতিহাসের এক অসীম সাহসী যুদ্ধ। শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণেরও অন্তত ৯০% অবলম্বন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে|’’

ভারতের রাষ্ট্রপতি রেড্ডির ভাষ্যঃ

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ, সাধারণ সৈনিক এবং বিশ্ববাসীর কাছে জিয়াউর রহমান বরাবরই রয়ে গেছেন কিংবদনত্দীর মহানায়ক। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ মেজর জিয়ার জেড ফোর্সের যুদ্ধকে তুলনা করেছেন স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধের সঙ্গে। 1971 সালের 11 এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ভাষণে তাজউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন_”চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের উপর। নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রামে যে প্রতিরোধ বূ্যহ গড়ে উঠেছে তা স্বাধীনতার ইতিহাসে স্ট্যালিনগ্রাডের পাশে স্থান পাবে।” স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদ বলেন, “এই প্রাথমিক বিজয়ের সাথে সাথে মেজর জিয়াউর রহমান একটি পরিচালনা কেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকে আপনারা শুনতে পান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর” (স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র দ্বিতীয় খণ্ড)। 1977 সালের 27 ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান ভারতে গেলে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন_ “একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা দানকারী হিসেবে আপনার মর্যাদা এরই মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত।”

তাজউদ্দিনের ভাষ্যঃ

নিঃশংসয়ে বলা যায়, সিদ্দিক সালিক কথিত বেতার তরঙ্গে প্রচারিত শেখ মুজিবের ওই স্বাধীনতা ঘোষণার কথাই মুজিবনগরে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নির্মিত হবার পর দিন ১১ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এ সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে যে ভাষণ দেন, তা আমাদের দেখা দরকার। তাজউদ্দিন আহমদের সে ভাষ্য, ‘লড়াইরত আমাদের বাহিনীর চমৎকার সাফল্য এবং প্রতিদিন তাদের শক্তির সঙ্গে জনবলের বৃদ্ধি এবং দখলীকৃত অস্ত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে, যা মেজর জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে প্রথম ঘোষিত হয়, সক্ষম করেছে পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল বেস প্রতিষ্ঠা করতে, যেখান থেকে মুক্তাঞ্চলের প্রশাসনিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে।’

জিবলু রহমান এর গ্রন্থ থেকেঃ

দেশপ্রেমিক জিয়া গ্রন্থে (পৃষ্ঠা. ৬-১২, আয়শা কিতাব ঘর, ফেব্রুয়ারি ১৯৯১) বজলুর রহমান লিখেছেন, ‘‘ ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। পান্ডুলিপি লেখক, শিল্পী, প্রযোজক এবং রেডিওর কলা কুশলীর একটি ছোট দল চট্টগ্রামে একত্রিত হলো। তাদের সকলেরই উদ্দেশ্য বাংলাদেশের জন্য একটা কিছু করতে হবে। এটা ছিল এ ধরনের লোকদের জন্য অভিনব একটি সাহসী পদক্ষেপ। এর ঘণ্টাখানেক আগে শুধু চট্টগ্রাম সেনানিবাসেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এক রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এক হাজারেরও বেশি বাঙ্গালী সৈন্যকে হত্যা করে। এই দুঃসাহসী দলের লোকসংখ্যা দশজনের বেশি ছিল না। প্রথমেই তারা চট্টগ্রামের রেডিও স্টেশন বন্ধ করার উদ্যোগ নিলো। তখন চট্টগ্রামের রেডিও ঢাকা থেকে প্রচারিত মার্শাল-ল’ এর নির্দেশ সম্প্রচার করছিল। এই বিদ্রোহী দল সেখানেই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র গঠন এবং পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচারের উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যদিও দু’দিন পরেই এর নাম পরিবর্তন করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র রাখা হয়। এর কার্যক্রম শুরু করার জন্যে এই দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদ ক্যাপ্টেন (পরে মেজর) রফিকুল ইসলামের সাহায্য প্রার্থনা করেন। রফিকুল ইসলাম তার প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও পরে তিনি অন্যত্র ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তার পক্ষে এই দলকে সাহায্য করা সম্ভব হয়নি। পরদিন এই দলের সদস্যরা জানতে পারলেন যে, পটিয়ায় বাঙ্গালী সৈন্যদের আরেকটি দল অবস্থান করছে। তারা অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য যারা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মেজর জিয়া। এই দলটি মেজর জিয়ার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজী হন এবং সেদিনই তারা বিকেলে কালুরঘাটে এসে পৌঁছান। বেলাল মোহাম্মদ ও তার বন্ধুরা দৃঢ় চিত্তে জিয়াকে পেয়ে খুশি হয়ে ওঠেন। জিয়া তখন তাদের বলেছিলেন, আমরা দু’দিনের মধ্যে পাকিস্তানী আর্মীদের ধ্বংস করে দেবো। তারা আরো খুশি হয়েছিলেন এ জন্যে যে, জিয়া তার সৈন্যদের দ্রুত রেডিও ট্রান্সমিটার স্টেশনের চারদিকে প্রতিরোধমূলক অবস্থানের নির্দেশ দেন। কালুরঘাটে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, মেজর জিয়ার ঐ ঘোষণা শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র বিশ্বের মানুষকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, বাঙ্গালী জাতিকে নির্মূল করার পাকিস্তানী চক্রান্তের বিরুদ্ধে বীর বাঙ্গালী রুখে দাঁড়িয়েছে। শুরু করেছে শক্ত প্রতিরোধ,৩০ মার্চ তারিখেই পাকিস্তানী বিমানবাহিনী কালুরঘাটস্থ বেতার কেন্দ্রটি ধ্বংস করে দেয়। পরে বেলাল মোহাম্মদের নেতৃত্বে মোস্তফা আনোয়ার, আবদুল্লাহ আল ফারুক, সৈয়দ আহমদ শাকের, রশিদুল হাসান, রেজাউল করিম চৌধুরী, আমিনুর রহমান, শরফুজ্জামান, কাজী হাবীবুদ্দিন আহমদ, শুকুর মিয়া, হারুন ও সেকান্দরসহ প্রায় ১৫ জনের এই দলটি প্রায় বিশজন বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ানের কঠোর পাহারায় পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড় চলে যান। তাদের সঙ্গে ছিল মাত্র এক কিলোওয়াটের একটি শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার।এখান থেকেই তারা অনিয়মিতভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার অব্যাহত রাখেন।পরে ৫০ কিলোওয়াটের একটি ট্রান্সমিটার মুজিব নগরে স্থাপন করা হয় এবং সেখান থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়।’’

আওয়ামীলীগ নেতা এম.এ.মোহাইমেনঃ

স্বাধীনতার দাবী নয়, পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রমাণের জন্যই শেখ মুজিব পাক-বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এ সম্পর্কে সাবেক আওয়ামী লীগ এম.পি. মরহুম এম.এ. মোহাইমেন তার ঢাকা আগরতলা-মুজিব নগর গ্রন্থে লিখেছেন, “শেখ সাহেবের এভাবে সেদিন রাতে ধরা দেয়াকে আমি কোনদিন মনের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে খাপ খাওয়াতে পারিনি। অন্যেরা যে যাই বলুক, আমার নিজের ধারণা আওয়ামী লীগের নেতারা তাজউদ্দীন সাহেবের নেতৃত্বে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করে এভাবে দেশ স্বাধীন করবে, এটা তিনি ভাবতে পারেননি। তার ধারণা ছিল অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পাকবাহিনী অবস্থা আয়ত্ত্বে নিয়ে আসতে পারবে। এছাড়া তার এ ধারণাও ছিল যে, আগরতলা মামলার সময় তাকে যেভাবে দেশের মানুষ আন্দোলন করে জেল থেকে বের করে এনেছিল, সেভাবে দু’তিন বছর পরে তুমুল আন্দোলনের ফলে পাকিস্তান সরকার তাকে মুক্তি দিয়ে মতা তার হাতে অর্পণ করতে বাধ্য হবে।”

শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষনা করেন নি এটা ধ্রুব সত্য।এর একটি প্রমান পাওয়া যায় সেটা হলো মুজিব ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আহরনের পর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষনার দলিল সমুহ নষ্ট করে ফেলেন।মনে হয় সরকারি গ্যাজেট এর মাধ্যমে এটা বাতিল করা হয়।পরবর্তিতে হাসান হাফিজুর রহমানের স্বাধীনতার দলিল পত্রে জিয়ার বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে ঘোষনাটি মুছে ফেলা হয়।মুক্তিযুদ্ধের পর এই ঘোষনা দেবার পুরস্কার সরুপ জিয়াকে শফিউল্লাহর নিচে পদ দেয়া হয়।জিয়াউর রহমানে প্রতি এমন একটি অবস্থান নিয়েছিলো মুজিব যে ধারনা করা হচ্ছিলো তাজউদ্দিনের পথ ধরে তাকেও হয়তো সেনাবাহিনী ছেড়ে দিতে হতে পারে।জিয়াউর রহমান তার মুজিবের প্রতি বিশ্বাস সৃষ্টি এবং দেশের মানুষের কাছে মুজিবের ভাবমূর্তি বাড়ানোর জন্য একটা লেখা লেখেন।সেটা নিয়ে আজকাল আওয়ামী লিগের অনেকে রেফারেন্স টেনে কথা বলে থাকেন।

শেখ মুজিব যেই কাজটি তার ২৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে করতে পারেন নি, সেটা জিয়া একটি ঘোষনার মাধ্যমে সেই কাজটি করেছেন।

(Source: https://bit.ly/2Cw5E6l)

Close Menu
×